অর্থসংকটে গাজায় ৫ লাখ মানুষ খাদ্যসহায়তা হারাচ্ছেন, রেশন অর্ধেক করল জাতিসংঘ
অর্থের অভাবে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় প্রায় ৫ লাখ মানুষের খাদ্যসহায়তা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। একই সঙ্গে খাদ্য রেশন অর্ধেক করা হয়েছে, কমানো হয়েছে রান্না করা খাবার বিতরণের পরিমাণ এবং ৭৫ হাজার পরিবারের নগদ সহায়তার অর্থমূল্যও হ্রাস করা হয়েছে। শীত ঘনিয়ে আসার মধ্যে এ সিদ্ধান্তে গাজার খাদ্যসংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, খাদ্যসহায়তা চালু রাখতে আগামী ছয় মাসে জরুরি ভিত্তিতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। সংস্থাটির হিসাবে, গাজার প্রায় ১৪ লাখ মানুষ এখনো তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছেন।
১৬ লাখ থেকে কমে সহায়তা পাচ্ছেন ১১ লাখ মানুষ
ডব্লিউএফপির ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, গত মাসে গাজায় সংস্থাটির নিয়মিত খাদ্যসহায়তা পেতেন প্রায় ১৬ লাখ মানুষ। অর্থসংকটের কারণে এ মাস থেকে সেই সংখ্যা কমিয়ে ১১ লাখে নামানো হয়েছে। ফলে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সংস্থাটির আগের নিয়মিত খাদ্যসহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
খাদ্যসহায়তার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। আগে সহায়তাপ্রাপ্ত পরিবারগুলো দুটি খাদ্যপ্যাকেট পেলেও এখন পাবে একটি। পাশাপাশি গমের আটার পরিমাণও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যেসব পরিবার রান্না করা খাবারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ডব্লিউএফপির দৈনিক গরম খাবার বিতরণ ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে কমিয়ে ১ লাখ ৫০ হাজারে নামানো হয়েছে। দুর্গম এলাকায়, বিশেষ করে ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছাকাছি বসবাসকারী কিছু পরিবার এখন প্রতিদিনের পরিবর্তে এক দিন পরপর গরম খাবার পাবে।
এ ছাড়া ৭৫ হাজার পরিবারের নগদ সহায়তার অর্থমূল্যও কমানো হয়েছে। ফলে খাদ্যপণ্য বাজারে পাওয়া গেলেও অনেক পরিবারের পক্ষে তা কেনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
গাজার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায়
ডব্লিউএফপির হিসাব অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৪ লাখ মানুষ—মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৭ শতাংশ—সংকটপূর্ণ বা তার চেয়েও ভয়াবহ খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় দুই লাখ মানুষ জরুরি পর্যায়ের খাদ্যসংকটে রয়েছেন, যাঁদের জীবন বাঁচাতে অবিলম্বে খাদ্যসহায়তা প্রয়োজন।
সংস্থাটি জানিয়েছে, গাজার প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে মাত্র একজন পর্যাপ্ত বৈচিত্র্যময় খাবার পাচ্ছে। অন্যদিকে, উপত্যকাটিতে বেকারত্বের হার ৮০ শতাংশের বেশি। ফলে অনেক পরিবার পর্যাপ্ত খাবার কেনার সামর্থ্য হারিয়েছে।
যদিও ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির পর খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, ডব্লিউএফপি বলছে, সেই অগ্রগতি এখনো নাজুক। মানবিক সহায়তা কমতে থাকলে পরিস্থিতি আবার দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে।
খাদ্য সরবরাহে বাধা বাড়াচ্ছে সংকট
অর্থসংকটের পাশাপাশি গাজায় খাদ্য সরবরাহের বাধাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গাজায় বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। ইসরায়েলের মানবিক কার্যক্রম সমন্বয়কারী সংস্থা কোঅর্ডিনেটর অব গভর্নমেন্ট অ্যাক্টিভিটিজ ইন দ্য টেরিটরিজ (কোগাট) জানিয়েছিল, হামাসের আরোপিত ট্রাকপ্রতি ১০ হাজার শেকেলের ফি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিরোধের কারণে বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশে বিঘ্ন ঘটেছে।
তবে ১৯ অক্টোবর ইসরায়েল বাণিজ্যিক ট্রাক প্রবেশের সমন্বয় পুনরায় শুরু করার কথা জানায়। ফলে পণ্য সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও গাজার খাদ্যসংকট কাটাতে আরও নিয়মিত ও পর্যাপ্ত সরবরাহ প্রয়োজন।
বিশেষ করে ফল, মাংসসহ পচনশীল খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। মানবিক সংস্থাগুলো সাধারণত এসব পণ্যের সব চাহিদা পূরণ করতে পারে না। ফলে বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশে বাধা তৈরি হলে খাদ্যের প্রাপ্যতা ও দাম—দুই ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
ডব্লিউএফপি আরও জানিয়েছে, গাজার ৭০ শতাংশের বেশি কৃষিজমিতে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। বর্তমানে মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ কৃষিজমি ব্যবহারযোগ্য থাকায় স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনও ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।
পশ্চিম তীরেও কমেছে খাদ্যসহায়তা
শুধু গাজা নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরেও অর্থসংকটের প্রভাব পড়েছে। ডব্লিউএফপি সেপ্টেম্বরে সেখানে খাদ্যসহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা চার লাখ থেকে কমিয়ে দুই লাখে নামিয়েছে। অর্থাৎ পশ্চিম তীরেও আরও দুই লাখ মানুষ সংস্থাটির আগের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাউ বলেছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতির এক বছর পেরিয়ে গেলেও মানুষের জীবন এখনো অত্যন্ত কঠিন। পর্যাপ্ত আশ্রয়, মৌলিক পরিষেবা ও নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। শীতের আগে সহায়তা কমে যাওয়ায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
ছয় মাসের কার্যক্রম চালাতে প্রয়োজন ৪৫০ মিলিয়ন ডলার
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে তাদের জরুরি কার্যক্রম চালু রাখতে অক্টোবর ২০২৬ থেকে মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত আগামী ছয় মাসে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। সংস্থাটি বলছে, ২০২৬ সালে ফিলিস্তিনে তাদের কার্যক্রমের জন্য পাওয়া অর্থ আগের বছরগুলোর তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
তহবিলের ঘাটতি অব্যাহত থাকলে খাদ্য বিতরণ, নগদ সহায়তা এবং পুষ্টিসংক্রান্ত কার্যক্রম আরও সংকুচিত হতে পারে। বর্তমানে সংস্থাটি গাজার প্রায় তিন লাখ নারী ও শিশুর জন্য পুষ্টিসহায়তা এবং দুই লাখ শিশুর জন্য স্বাস্থ্যকর স্কুল নাশতা সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি উপত্যকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রুটির চাহিদা পূরণকারী বেকারিগুলোতেও সহায়তা দিচ্ছে।
ডব্লিউএফপির মতে, এসব কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে জরুরি অর্থায়ন প্রয়োজন। অন্যথায় সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যনিরাপত্তায় যে সামান্য উন্নতি হয়েছে, তা আবারও হারিয়ে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, গাজায় খাদ্যসহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো খাদ্যসংকট, বাস্তুচ্যুতি ও মৌলিক পরিষেবার অভাবে ভুগছেন। অর্থসংকট, সীমিত খাদ্য সরবরাহ এবং শীতের আগমন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে গাজা ও পশ্চিম তীরের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
