রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলা ঘিরে ট্রাম্প-জেলেনস্কির বিরোধ তীব্র
রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলা বন্ধের দাবি ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। দুই নেতা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রকাশ্যেই একে অপরের সমালোচনা করেছেন। ওয়াশিংটনের চাপ সত্ত্বেও রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনড় রয়েছে কিয়েভ। এতে ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা লক্ষ্য করে ইউক্রেনের হামলা। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এসব হামলা বন্ধ করে শান্তি আলোচনার পথ তৈরি করা উচিত। অন্যদিকে, ইউক্রেনের অবস্থান হলো—রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে দেশটির বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে আসছে; এর জবাবে রুশ ভূখণ্ডের জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা নিয়ে বিরোধ
গত ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইউক্রেনকে রাশিয়ার ডিজেল অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানাতে শুরু করেন। এর পরের সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেল পরিবহনেও ইউক্রেনের হামলা হয়েছে কি না, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ রয়েছে।
ইউক্রেন দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে আসছে। কিয়েভের যুক্তি, রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক ভিত্তিতে চাপ সৃষ্টি করতে এ ধরনের অভিযান প্রয়োজন। মস্কোও ইউক্রেনের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে যাওয়ায় সংঘাতের পাল্টাপাল্টি আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতিও বিরোধকে জটিল করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের পর বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান দলের আইনপ্রণেতারাও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের মুখে পড়ছেন।
রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানিতে ছাড়
ইউক্রেন হামলা বন্ধ না করায় অসন্তুষ্ট ট্রাম্প গত ৯ অক্টোবর রাশিয়ার ডিজেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ দিতে একটি সাময়িক সাধারণ লাইসেন্সের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কিছু বিধান থেকেও ছাড় দেওয়া হয়।
এ সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞানীতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের সমর্থকদের আশঙ্কা, রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যে ছাড় দেওয়া হলে মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তা সুরিয়া জয়ন্তী, যিনি বর্তমানে ইউক্রেনের জ্বালানি খাতে কাজ করেন, বলেছেন, ট্রাম্প ১১ অক্টোবর একতরফাভাবে জ্বালানি যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলা বেড়েছে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে কিয়েভে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য বন্ধের হুমকি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করেছিলেন যে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করে দিতে পারে।
তবে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একজন মার্কিন কর্মকর্তা কিয়েভের এ বিবরণের সঙ্গে দ্বিমত জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ইউক্রেনের ওপর চাপ বাড়ানো হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জেলেনস্কি সমঝোতায় পৌঁছাতে চাইলে চুক্তি করতে পারেন; অন্যদিকে রাশিয়ার ওপর ইউক্রেনের হামলা সত্ত্বেও মস্কো এখন পর্যন্ত তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি।
ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে স্টারলিংক স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থার ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সাময়িকভাবে এ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় ইউক্রেনের ড্রোন পরিচালনা ব্যাহত হয়েছিল। বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানান, তিনি স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ককে ইউক্রেনের স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ পুনরুদ্ধারে অনুরোধ করেছেন।
শান্তি আলোচনায় নতুন উদ্যোগ
ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। গত ২০ অক্টোবর অসলোতে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ইউক্রেন নতুন প্রস্তাব উপস্থাপন করে। সেখানে ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার আবারও রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারে হামলা বন্ধের দাবি তুলে ধরেন।
এর পরদিন মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সেন্ট পিটার্সবার্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকের পর আটক মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয় রাশিয়া। দুই দেশই পদক্ষেপটিকে সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা নভেম্বরের প্রথমার্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে বৈঠক করবেন। তিন দেশের শীর্ষ নেতাদের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে।
