ব্রাজিলের নির্বাচনে বড় ইস্যু মূল্যস্ফীতি, অপরাধ ও দুর্নীতি

৫ মিনিটে পড়ুন৪ বার পড়া হয়েছে

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটে জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ, দুর্নীতি, সরকারি ঋণ এবং বৈদেশিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ভোটারদের উদ্বেগ সামনে এসেছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিওর সঙ্গে লুলার এ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অর্থনৈতিক নীতি ও দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী বিষয় হয়ে উঠেছে।

নির্বাচনী প্রচারে দুই প্রার্থীই জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এসব সমস্যা সমাধানে তাঁদের প্রস্তাব ও রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়

ব্রাজিলের ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। আগস্টে পরিচালিত কোয়েস্ট জরিপে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি উত্তরদাতা জানান, আগের বছরের তুলনায় তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে। খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবারগুলোর ব্যয়ের চাপ বেড়েছে।

লুলা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ঋণের সুদের হার ধীরে ধীরে কমানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, ফ্লাভিও বলসোনারো সরকারি ঋণ কমানো ও স্থিতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি অর্থব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারলে সুদের হার কমানোর পরিবেশ তৈরি হবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।

অপরাধ দমনে দুই প্রার্থীর ভিন্ন পরিকল্পনা

নিরাপত্তা ব্রাজিলের আরেকটি বড় নির্বাচনী ইস্যু। দেশটির অপরাধবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রাজিলিয়ান পাবলিক সিকিউরিটি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশটিতে হত্যার হার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি সব এলাকায় সমান হয়নি।

ফ্লাভিও বলসোনারো অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর পরিকল্পনায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার প্রতিষ্ঠা এবং গুরুতর যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে রাসায়নিক খোজাকরণের মতো কঠোর শাস্তির প্রস্তাব রয়েছে।

অন্যদিকে, লুলা ফেডারেল কারাগারে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের নেতাদের আটক রাখার সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেছেন। পাশাপাশি দরিদ্র এলাকাগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাব কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে একজন প্রার্থী কঠোর শাস্তি ও কারাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন, আর অন্যজন আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।

দুর্নীতির অভিযোগে রাজনৈতিক বিতর্ক

দুর্নীতির অভিযোগও নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। লুলার ঘনিষ্ঠ মহল এবং ফ্লাভিও—দুই পক্ষই বিভিন্ন আলোচিত তদন্তের কারণে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে রয়েছেন।

মাঝারি আকারের ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ব্যাংকো মাস্টারের পতনকে কেন্দ্র করে একাধিক তদন্ত শুরু হয়েছে। এসব তদন্তের মধ্যে ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে কথিত দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগও রয়েছে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ফ্লাভিও সরকারি প্রতিষ্ঠান ও পেনশন তহবিলে রাজনৈতিক নিয়োগ সীমিত করা এবং সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা বাড়ানোর মাধ্যমে দুর্নীতি মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অন্যদিকে, লুলা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম ও স্বচ্ছতাসংক্রান্ত নীতি আরও জোরদারের কথা বলেছেন। তবে তাঁর ছেলের বিরুদ্ধেও প্রভাব খাটানো, দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগে তদন্ত চলছে। তাঁর ছেলে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সরকারি ঋণ ও উচ্চ সুদের চাপ

ব্রাজিলের অর্থনীতিতে সরকারি ঋণের চাপও নির্বাচনী আলোচনায় উঠে এসেছে। পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয়, ঋণ পরিশোধ এবং উচ্চ সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে সুদের হার দীর্ঘদিন বেশি থাকায় অনেক পরিবার ঋণের কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়েছে।

লুলার বর্তমান মেয়াদে সরকারি ঋণ জিডিপির তুলনায় ১০ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি বেড়ে ৮২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশটির নীতিনির্ধারণী সুদের হার ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা বিশ্বের উচ্চ সুদের হারগুলোর মধ্যে অন্যতম।

ফ্লাভিও ১৮ মাসের মধ্যে প্রাথমিক বাজেট ভারসাম্যে জিডিপির তুলনায় ১ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট উন্নতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। অন্যদিকে, লুলা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রাথমিক বাজেটে প্রায় ১ দশমিক ৩ শতাংশের কার্যকর উদ্বৃত্ত অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। চলতি বছরের জন্য প্রাথমিক বাজেটে জিডিপির ০ দশমিক ৪ শতাংশ ঘাটতির পূর্বাভাস রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রাজিলের বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করার পর বৈদেশিক সম্পর্কও নির্বাচনী প্রচারে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

ফ্লাভিও যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক ডানপন্থী মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি আর্জেন্টিনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের কথা বলেছেন।

অন্যদিকে, লুলা বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং দক্ষিণ আমেরিকার মারকোসুর জোট ও ব্রিকস দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন।


Bhinno Britto

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল প্রকাশ করা হবে না। মন্তব্য সম্পাদকীয় অনুমোদনের পর প্রকাশিত হয়।